আদর্শ নিউজ। আব্দুল আজিজ ইবনে শফিক


তাবলিগ জামাতে চলমান সংকট নিরসনে দেশব্যাপী ওযাহাতি জোড়ের অংশ হিসেবে গত শুক্রবার (১২ অক্টোবর) টঙ্গীর কলেজ গেইট পাইলট ময়দানে অনুষ্ঠিত জোড় থেকে ৯টি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়।

তাবলিগ জামাতের চলমান সঙ্কটকে কেন্দ্র করে সাধারণ মানুষের কাছে প্রকৃত বিষয় ও ওলামায়ে কেরামের অবস্থান তুলে ধরতে দেশব্যাপী শুরু হয়েছে বিশেষ এ ওযাহাতি জোড়।

 

গত শুক্রবার বিকেল ৩ টা থেকে টঙ্গীতে তারই অংশ হিসেবে বিশেষ এ জোড় শুরু হয়। জোড়ে টঙ্গির ৫০টি  হালকার দাওয়াত ও তাবলিগের সাথীগণ, ধর্মপ্রাণ মুসলমান এবং আলেমসহ মাদরাসার ছাত্ররা অংশ নেন বলে জানা যায়।

অনুষ্ঠিত জোড়ে ফরিদাবাদ মাদরাসার মুহতামিম ও বেফাকের মহাসচিব মাওলানা আবদুল কুদ্দুস, মারকাযুদ দাওয়া আলইসলামিয়ার আমিনুত তালিম মাওলানা আবদুল মালেক, জামিয়া রাহমানিয়ার প্রিন্সিপাল মাওলানা মাহফুজুল হক, জামিয়াতুল আবরার রাহমানিয়ার মুফতি মানসূরুল হক, আল্লামা নুরুল ইসলাম ওলীপুরী,  শাইখ যাকারিয়া ইসলামি রিসার্স সেন্টারের পরিচালক মুফতি মিযানুর রহমান সাঈদ,  টঙ্গী দারুল উলুম মাদরাসার প্রিন্সিপাল মুফতি মাসউদুল করীম, মাসনা মাদরাসার মাওলানা ইয়াহইয়া, উত্তরা ১৪ নং সেক্টরের বায়তুল আমান মসজিদের খতিব মাওলানা আহমাদ আলী, মাওলানা খালিদ সাইফুল্লাহ আইয়ুবী, কাকরাইলের মুরুব্বি মাওলানা রবিউল হক, ইঞ্জিনিয়ার আব্দুল মুকিত, মুফতি কেফায়াতুললাহ আজহারী প্রমুখ ওলামায়ে কেরাম দিক নির্দেশনামূলক বয়ান পেশ করেন।

 

১। জমহুর উলামায়ে কেরাম একমত হয়েছেন তিনটি মৌলিক কারণে:-

ক. কুরআন ও হাদীসের মনগড়া ব্যাখ্যা। খ. তাবলীগের গুরুত্ব বুঝাতে গিয়ে তাবলীগ ব্যতীত দ্বীনের অন্যান্য মেহনতকে যথা দ্বীনি শিক্ষা ও তাসাউফ ইত্যাদিকে হেয় প্রতিপন্ন করা। গ. পূর্ববর্তী তিন হযরতজীর উসূল ও কর্মপন্থা থেকে সরে যাওয়ার কারণে বর্তমানে মাওলানা সা’দ সাহেবকে অনুসরণ করা সম্পূর্ণভাবে বর্জনীয় ও নিষিদ্ধ।।

২। মাওলানা সা’দ সাহেব হযরত মাওলানা এনামুল হাসান রহ. এর রেখে যাওয়া শুরায়ী নেযামকে উপেক্ষা করে নিজেই নিজেকে আমীর দাবী করেছেন, যা শরীয়ত বিরােধী। তাই তার কোন সিদ্ধান্ত এবং ফায়সালা বা নির্দেশ কাকরাইল তথা বাংলাদেশে বাস্তবায়ন করা যাবে না।।

৩। দারুল উলুম দেওবন্দ আশংঙ্কা প্রকাশ করেছে যে, মাওলানা সাদ সাহেব আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের মতাদর্শ থেকে সরে গিয়ে নতুন কোন ফেরকা গঠনের অপচেষ্টা চালাচ্ছেন।

এহেন পরিস্থিতিতে বালাদেশের কোনো জামাত বা ব্যক্তিকে নিযামুদ্দীনে পাঠানাে বা যাওয়া মুনাসিব হবে না। অনুরুপভাত নেযামুদ্দিন থেকে আগত কোনাে জামাতকে কোন জেলায়/থানা/ইউনিয়নে কাজ করার সুযোগ দেওয়া যাবে না।

৪. মাওলানা ইলিয়াস রহ., মাওলানা ইউসুফ রহ. ও হযরত মাওলানা এনামুল হাসান রহ এর বাতলানো পদ্ধতিতে তাবলিগের কাজ সারা দুনিয়ায় সমা সমাদ্ভূত ও গৃহীত হয়েছে।

তাই বাংলাদেশে এই তিন হযরতের পদ্ধতিতে এবং উলামায়ে কেরামের তত্ত্বাবধানে তাবলিগের কাজ পরিচালিত হবে। নতুন কোন পদ্ধতি চালু করা যাবে না।  কাকরাইল ও টঙ্গী ময়দান এবং জেলা মারকাযসহ সকল মারকায এই নীতিতেই পরিচালিত হবে।

৫। কাকরাইল মসজিদের যে সকল শুরা সদস্য আমরণ মাওলানা সা’দ সাহেবের ভ্রান্ত আকীদা অনুসরণের শরীয়ত পরিপন্থী হলফ নামা করেছেন, তারা শুরাসদস্য থাকার যোগ্যতা হারিয়ে ফেলেছেন। অতএব তাদেরকে তাবলীগের কাজে শুরা ও ফায়সাল না রাখার আহ্বান জানানাে যাচ্ছে।

৬। ২০১৮ সালের বিশ্ব ইজতেমার পূর্বে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহোদয়ের সভাপতিত্বে ত্রিপক্ষীয় তথা ১. কাকরাইলের আহলে শুরা ২. শীর্ষস্থানীয় উলামায়ে কেরাম ৩. স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সমন্বয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকে গৃহীত সিদ্ধান্তগুলাের বাস্তবায়ন অব্যাহত রাখার জোর আহ্বান জানানাে যাচ্ছে।

সিদ্ধান্তগুলাে নিম্নরূপ – 

 

 

ক, মাওলানা সা’দ সাহেব দারুল উলুম দেওবন্দের সাথে মতপার্থক্য দূর করত: দারুল উলুম দেওবন্দের আস্থা অর্জন না করা পর্যন্ত বাংলাদেশে আসতে পারবেন না।

খ. নিযামুদ্দীনের যে সকল আকাবির উলামায়ে কেরাম মাওলানা সা’দ সাহেবের সাথে দ্বিমত পােষণ করে মারকায় ত্যাগ করে চলে গেছেন, তাদের সাথে সমস্যা নিরসন করে একসাথে বাংলাদেশে আসবেন, একা আসবেন না।

৭। বর্তমান প্রেক্ষাপটে দেশ ও জাতির শান্তি শৃঙ্খলা রক্ষার্থে উল্লেখিত বিষয় দু’টির সমাধান না হওয়া পর্যন্ত মাওলানা সা’দ সাহেবের কোনাে পরামর্শ ও নির্দেশনা তাবলীগের সাথী ভাইগণ এদেশে চালানাের চেষ্টা করবেন না; বরং এদেশের দাওয়াত ও তাবলীগের মেহনত কাকরাইল মারকাযের মুরুব্বীদের পরামর্শক্রমেই চলবে।

৮। এবারের পাঁচ দিনের জোড় ৭,৮,৯,১০,১১ ডিসেম্বর ২০১৮ইং অনুষ্ঠিত হবে। ২০১৮ এর টঙ্গী ইজতেমায় সরকারের সাথে পরামর্শক্রমে আগামী ২০১৯ইং এর টঙ্গী ইজতেমার জন্য নির্ধারিত তারিখ প্রথম পর্ব ১৮,১৯,২০ জানুয়ারী ও দ্বিতীয় পর্ব ২৫,২৬,২৭ জানুয়ারীর সাথে আজকের মজমা ঐকমত্য পোেষণ করছে।

৯। ২০১৯ সালের ইজতেমার আগে ও পরে কোনাে জেলাওয়ারী ইজতেমা হবে না। উপরােক্ত ঘােষণাসমূহ যথাযথ বাস্তবায়নে এবং বর্তমানে দাওয়াত ও তাবলীগের কাজে সৃষ্ট বিশৃঙ্খলারােধে সরকারের সার্বিক সহযােগিতা কামনা করা হচ্ছে।

জোড়ে অধিকাংশ আলোচক যে বিয়য়ে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেন তা হচ্ছে, এতায়াতিরা বলে এগুলো নাকি কেবল মাদরাসার ছাত্র-শিক্ষকদের জোড়। এখানে নাকি তাবলিগের কোনো সাথী নাকি নেই। মাদরাসার ছাত্র-শিক্ষক ব্যতিত যে সকল সাধারণ শিক্ষিত মানুষ তাবলীগে সময় লাগিয়েছেন আলোচকগণ তাদেরকে হাত উচু করতে বলেন। দেখা যায়, মজমার অধিকাংশ লোকই তাবলিগের সাথী। তাদের তুলনায় মাদরাসার ছাত্র-শিক্ষকদের পরিমাণ কম। গত কয়েকটি জোড়ের মতো টঙ্গীতেও পানি, শরবত, বিস্কিট, রুটি, কেক ইত্যাদির মাধ্যমে সাথীদের আপ্যায়ন করা হয়। বিশ্ব ইজতেমার ময়দান টঙ্গীতে হওয়ায় টঙ্গীর এই জোড়ের দিকে সংশ্লিষ্ট সবার নজর ছিল। বিশেষত স্থানীয় প্রশাসনের বক্তব্য ও মনোভাব জানতে আগ্রহী ছিলেন সবাই।

স্থানীয় সাংসদ জাহিদ আহসান রাসেল বলেন, সরকার ওলামায়ে কেরামের সঙ্গে আছেন। আগামী ইজতেমা নির্ধারিত সময়ে ওলামায়ে কেরামের তত্ত্বাবধানেই হবে।

রাত দশটায় কাকরাইলের শুরা মুরুব্বী এবং বর্ষীয়ান আলেমে দ্বীন মাওলানা যুবায়ের সাহেব স্টেজে আসেন। উম্মাহ ও দেশের জন্য তাঁর দোয়ার মাধ্যমে দুপুর থেকে চলা জোড়ের সমাপ্তি হয়। দাওয়াত ও তাবলীগের চলমান সংকট নিয়ে স্থানীয় সাধারণ মানুষ ও তাবলিগি-সাথীদের মধ্যে যে অস্পষ্টতা, দ্বিধাদ্বন্দ্ব ও প্রশ্ন ছিল, এই জোড়ের মাধ্যমে তা দূরীভূত হয়ে গেছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। এ ধরনের ওযাহাতি জোড় সারা দেশেই চলতে থাকবে বলে তারা জানান।

 

মতামত দিন