বাংলাদেশের সংবিধানের ৫(ক) অনুযায়ী ঢাকা বাংলাদেশের রাজধানী। আর ২০১৯ সালের জন্য ঢাকাকে ওআইসি পর্যটন নগরী ঘোষণা করেছে। ২০১৮ সালের শুরুর দিকে দশম ইসলামিক কনফারেন্স অব ট্যুরিজম মিনিস্টার্সের সভায় ঢাকা এ বিশেষ গৌরব ও সম্মান অর্জন করে। ওআইসি সদস্যভুক্ত চারটি দেশকে টপকে এ সিটি অব ট্যুরিজমের মর্যাদা লাভ করে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা।

ভবিষ্যতে বিশ্বের পর্যটকদের কাছে অন্যতম পছন্দের গন্তব্য হবে বাংলাদেশ। এ জন্য ওআইসির ১৩০ কোটি টাকা আর্থিক সহায়তার আওতায় ইসলামী ঐতিহ্য সংরক্ষণের বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ফলে ঐতিহ্যবাহী মসজিদগুলোর সংস্কার ও সজ্জিতকরণ সম্ভব হবে। এতে ওআইসি সদস্যভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ বৃদ্ধি পাবে এবং পারস্পরিক সম্পর্কোন্নয়ন ঘটবে। ঢাকার পর্যটনগত ধর্মীয় গুরুত্ব বাড়বে, বাড়বে ঢাকা ভ্রমণের আগ্রহ। অন্যদিকে ওআইসির অঙ্গসংগঠন ইসলামিক এডুকেশনাল সায়েন্টিফিক অ্যান্ড কালচারাল অর্গানাইজেশন ২০১২ সালের জন্য ঢাকাকে ইসলামী সংস্কৃতির এশীয় অঞ্চলের রাজধানী ঘোষণা করে বিশ্ববাসীর কাছে বাংলাদেশের গুরুত্ব ও ঢাকার মর্যাদা তৈরি করেছে।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও পর্যটন গবেষক শারমিন সুলতানার মতে, ‘বাংলাদেশে ধর্মীয় ট্যুরিজমের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে, মসজিদগুলো পর্যটকদের জন্য আকর্ষণীয় স্থান। অন্যদিকে বাংলাদেশে হয় বিশ্ব ইজতিমা। এতেও বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন সম্ভব।’ এ জন্য তিনি ভিসা জটিলতা দূর ও বাংলাদেশকে ব্র্যান্ডিংয়ে গুরুত্ব দেওয়ার সুপারিশ করেছেন।

অর্থনীতিবিদ ড. মুহম্মদ মাহবুব আলী বলেন, বিশ্বে ৫৭টির মতো মুসলিম দেশে ১৬০ কোটি মুসলমান রয়েছেন। মুসলিম ঐতিহ্য দর্শনে আগ্রহী এ জনগোষ্ঠীকে ভ্রমণে উৎসাহিত করার মাধ্যমে অর্থনৈতিক উন্নয়নই হচ্ছে পর্যটন নগরী ঘোষণার মূল তাৎপর্য। তাঁর মতে, বিষয়টি হচ্ছে একটি শহরকে ফোকাস করা এবং বিশ্বব্যাপী ইসলামী কৃষ্টি-সংস্কৃতির গুরুত্ব বৃদ্ধি করা।

ঢাকাকে ওআইসি পর্যটন নগরী ঘোষণার তাৎপর্য লুকিয়ে আছে ঢাকার সোনালি ঐতিহ্যের আড়ালে। মোগল সম্রাট জাহাঙ্গীর ১৬ জুলাই ১৬১০ খ্রিস্টাব্দে ঢাকাকে সুবা বাংলার রাজধানীর মর্যাদা দিয়ে ফরমান জারি করেন। সুবেদার ইসলাম খান চিশতি ঢাকার গোড়াপত্তন করেন এবং মোগল সম্রাটের নামে রাজধানীর নামকরণ করা হয় ‘জাহাঙ্গীরনগর’। অনেক ঐতিহাসিকের মতে, সম্রাট জাহাঙ্গীরের ফরমান জারিতে ঢাকের বাজনার মাধ্যমে আনন্দ প্রকাশ করা হলে, লোকমুখে ওই বাদ্য-বাজনা কিংবদন্তির রূপ নেয় এবং শহরের নাম হয়ে যায় ঢাকা। তবে ঢাকার নামকরণ নিয়ে একাধিক মতামত রয়েছে।

১৬৫০ সালে সুবেদার শাহসুজা রাজমহলে রাজধানী স্থানান্তর করলে ঢাকার মর্যাদা ক্ষুণ্ন হয়। ১৬৬০ সালে সুবেদার মির জুমলা আবার রাজধানী ঢাকায় স্থানান্তর করেন। ১৭১৭ সালে সুবেদার মুর্শিদ কুলি খাঁ রাজধানী মুর্শিদাবাদে স্থানান্তর করেন। ১৯০৫ সালে ঢাকাকে আবার আসাম ও বাংলার রাজধানী করা হলেও পরে ১৯১১ সালে রাজধানী কলকাতায় ফিরিয়ে নেওয়া হয়। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর ঢাকা হয়ে যায় প্রাদেশিক রাজধানী।

ঢাকাকে কেন্দ্র করেই ৫২, ৫৪, ৬২, ৬৬, ৬৯, ৭০ ও ৭১-এর কালপরিক্রমায় রক্তঋণে অর্জিত হয় আমাদের স্বাধীনতা এবং লাল-সবুজের বিজয় পতাকা। স্বাধীন বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার পর্যটন গুরুত্বের অন্যতম আকর্ষণ ঢাকার মসজিদ স্থাপত্য। ‘মসজিদের শহর’ ঢাকায় ১০ হাজার মসজিদ রয়েছে (ই.ফা.বা. : দৈনিক ইত্তেফাক, ০৭.১২.১৪)

ঢাকার অন্যতম প্রাচীন নিদর্শন চকবাজার জামে মসজিদ। সুবেদার শায়েস্তা খাঁ ১৬৭৬ সালে মসজিদটি নির্মাণ করেন। নির্মাণশৈলীর কারণে যা কিনা ‘আবাসিক মাদরাসা মসজিদ’। মোহাম্মদপুর এলাকায় অবস্থিত ঢাকার ঐতিহ্য ‘সাত গম্বুজ মসজিদ’ নির্মিত হয় ১৬৭৬-১৬৮০ সালে। ব্যস্ত ঢাকার কারওয়ান বাজারে খাজা আম্বর ১৬৮০ সালে, মতান্তরে ১৬৭৭-৭৮ সালে যে মসজিদ নির্মাণ করেন, তা ‘আম্বর শাহ’ মসজিদ নামে সুপরিচিত। মোগল স্থাপত্যের নির্মাণশৈলীর একমাত্র উল্লেখযোগ্য সুবৃহৎ নিদর্শন ‘লালবাগ শাহী মসজিদ’। সুবেদার আজিমুশশানের প্রিয় শাহজাদার নামে একে ‘ফারুক সিয়ার মসজিদ’ও বলা হয়। মসজিদটি ১৭০৩-০৪ খ্রিস্টাব্দে নির্মিত হয়। মসজিদের সাদা ধবধবে গম্বুজে অসংখ্য তারার ‘মোটিফ’-এর কারণে ঢাকার গর্ব তারা মসজিদ। নির্মাতার নামে মসজিদটিকে (মির্জা গোলাম পীর, মৃত. ১৮৬০ খ্রিস্টাব্দ) ‘মির্জা সাহেবের মসজিদ’ও বলা হয়। আরমানিটোলার আবুল খায়রাত রোডে অবস্থিত মসজিদটি সম্ভবত উনিশ শতকের শুরুতে নির্মিত। এ ছাড়া ঢাকার অন্যতম মসজিদের তালিকায় আছে—ইসলাম খান মসজিদ (১৬৩৫-৩৯ খ্রিস্টাব্দ) শায়েস্তা খান মসজিদ (১৬৬৪-৭৮ খ্রিস্টাব্দ) খাজা শাহবাজ মসজিদ (১৬৭৯ খ্রিস্টাব্দ) আজিমপুর মসজিদ (১৭৪৬ খ্রিস্টাব্দ) আল্লাকুরি মসজিদ (মোহাম্মদপুর), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদ, গাউসুল আজম মসজিদ ইত্যাদি।

ঢাকার বেশ কিছু ঐতিহাসিক ও দর্শনীয় মসজিদের সংক্ষিপ্ত পরিচয়/তালিকা:-

চকবাজার শাহী মসজিদ: বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা শহরের পুরান ঢাকা এলাকার চকবাজারে অবস্থিত একটি মোগল আমলের মসজিদ। মোগল সুবেদার শায়েস্তা খাঁ এটিকে ১৬৭৬ খ্রিস্টাব্দে নির্মাণ করেন, মসজিদে প্রাপ্ত শিলালিপি থেকে এই ধারণা করা হয়। এই মসজিদটিই সম্ভবত বাংলায় উঁচু প্লাটফর্মের উপর নির্মিত প্রাচীনতম ইমারত-স্থাপনা। প্লাটফর্মটির নিচে ভল্ট ঢাকা কতগুলো বর্গাকৃতি ও আয়তাকৃতি কক্ষ আছে। এগুলোর মাথার উপরে খিলান ছাদ রয়েছে, যার উপরের অংশ অবশ্য সমান্তরাল। ধারণা করা হয়, এই মসজিদের প্লাটফর্মের নিচের কক্ষগুলোতে মাদ্রাসার ছাত্র ও শিক্ষকদের আবাসন ছিল, এধরণের ভবনগুলোকে বলা হয় ‘আবসিক-মাদ্রাসা-মসজিদ’।

মসজিদটির আদি গড়নে ছিল তিনটি গম্বুজ। অবশ্য বিভিন্ন সময়ে সংস্কারকার্য ও নির্মাণ সম্পাদনের ফলে বর্তমানে এর আদি রূপটি আর দেখা যায় না। মসজিদের ভিতরকার নকশা তিনটি বে’তে বিভক্ত ছিল, যার মাঝখানের বে ছিল বর্গাকার, কিন্তু দুপাশের বে ছিল আয়তাকার। তিনটি বে’র উপরেই গম্বুজ দিয়ে আচ্ছাদিত ছিল, মাঝখানের গম্বুজটি ছিল তুলনামূলক বড় আকৃতির। কেন্দ্রীয় মেহরাবটি অষ্টকোণাকৃতির, যা সংস্কারের পরে আজও সেরকমটাই রয়েছে।

বড় কাটরা: ঢাকায় অবস্থিত মুঘল আমলের নিদর্শন। সম্রাট শাহজাহানের পুত্র শাহ সুজার নির্দেশে ১৬৪১ খ্রিস্টাব্দে (হিজরী ১০৫৫) বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে এই ইমারতটি নির্মাণ করা হয়। এর নির্মাণ করেন আবুল কাসেম যিনি মীর-ই-ইমারত নামে পরিচিত ছিলেন। প্রথমে এতে শাহ সুজার বসবাস করার কথা থাকলেও পরে এটি মুসাফিরখানা হিসাবে ব্যবহৃত হয়।

এক সময় স্থাপত্য সৌন্দর্যের কারনে বড় কাটরার সুনাম থাকলেও বর্তমানে এর ফটকটি ভগ্নাবশেষ হিসাবে দাঁড়িয়ে আছে। এক সময় বড় কাটরার তোরণে ফারসি ভাষায় শাদুদ্দিন মুহম্মদ সিরাজী লিখিত একটি পাথরের ফলক লাগানো ছিল। যেখানে এই মুসাফির খানার নির্মাতা ও এর রক্ষনাবেক্ষনের ব্যয় নির্বাহের উপায় সম্পর্কে জানা যায়। ফলকে লেখা ছিল:

সুলতান শাহ্‌ সুজা সব সময় দান-খয়রাতে মশগুল থাকিতেন। তাই খোদার করুণালাভের আশায় আবুল কাসেম তুব্বা হোসায়নি সৌভাগ্যসূচক এই দালানটি নির্মাণ করিলেন। ইহার সঙ্গে ২২টি দোকানঘর যুক্ত হইল- যাহাতে এইগুলির আয়ে ইহার মেরামতকার্য চলিতে পারে এবং ইহাতে মুসাফিরদের বিনামূল্যে থাকার ব্যবস্থা হইতে পারে। এই বিধি কখনো বাতিল করা যাইবে না। বাতিল করিলে অপ্রাধী শেষ বিচার দিনে শাস্তি লাভ করিবে। শাদুদ্দিন মুহম্মদ সিরাজি কর্তৃক এই ফলকটি লিখিত হইল।

ছোট কাটারা: শায়েস্তা খানের আমলে তৈরি একটি ইমারত। আনুমানিক ১৬৬৩ – ১৬৬৪ সালের দিকে এ ইমারতটির নির্মান কাজ শুরু হয় এবং তা ১৬৭১ সালে শেষ হয়েছিল। এটির অবস্থান ছিল বড় কাটারার পূর্বদিকে বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে। ইমারতটি দেখতে অনেকটা বড় কাটারার মত হলেও এটি আকৃতিতে বড় কাটারার চেয়ে ছোট এবং এ কারণেই হয়তো এর নাম হয়েছিল ছোট কাটারা। তবে ইংরেজ আমলে এতে বেশ কিছু সংযোজন করা হয়েছিল।১৮১৬ সালে মিশনারি লিওনার্দ ঢাকার প্রথম ইংরেজি স্কুল।

বর্তমানে ছোট কাটারা বলতে কিছুই বাকি নেই শুধু একটি ভাঙা ইমারত ছাড়া। যা শুধু বিশাল তোড়নের মতন সরু গোলির উপর দাঁড়িয়ে আছে। চারদিকে অসংখ্য দোকান এমন ভাবে ঘিরে ধরেছে যে দেখে বোঝার উপায় নেই যে এখানে মুঘল আমলের এমন একটি স্থাপত্য ছিল।

শায়েস্তা খানের আমলে ছোট কাটরা নির্মিত হয়েছিল সরাইখানা বা প্রশাসনিক কাজে ব্যবহারের জন্য। কোম্পানি আমলে ১৮১৬ সালে মিশনারি লিওনারদ ছোট কাটরায় খুলেছিলেন ঢাকার প্রথম ইংরাজি স্কুল। ১৮৫৭ সালে, এখানে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল ঢাকার প্রথম নরমাল স্কুল। উনিশ শতকের শেষ দিকে অথবা বিশ শতকের প্রথম দিকে ছোট কাটরা ছিল নবাব পরিবারের দখলে। এবং তাতে তখন ‘ কয়লা ও চুণার কারখানার কাজ’ চলত।

বর্তমানে ছোট কাটরাকে প্রায় ধ্বংস করে ফেলা হয়েছে। এখন ছোট কাটরা অবৈধ দখলদারকবলিত। কিন্তু এখনও এর ধ্বংসাবশেষ দেখলে বোঝা যায় মোঘল আমলে নদীতীরে দাঁড়িয়ে থাকা কাটরাকে কী সুন্দরই না দেখাত!

সাত গম্বুজ মসজিদ: ঢাকার মোহাম্মদপুরে অবস্থিত মুঘল আমলে নির্মিত একটি মসজিদ। এই মসজিদটি চারটি মিনারসহ সাতটি গম্বুজের কারনে মসজিদের নাম হয়েছে ‘সাতগম্বুজ মসজিদ’। এটি মোঘল আমলের অন্যতম নিদর্শন। ১৬৮০ সালে মোগল সুবাদার শায়েস্তা খাঁর আমলে তার পুত্র উমিদ খাঁ মসজিদটি নির্মান করান। মসজিদটি লালবাগ দূর্গ মসজিদ এবং খাজা আম্বর মসজিদ এর সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। ঢাকার মোহাম্মদপুরে কাটাসুর থেকে শিয়া মসজিদের দিকে একটা রাস্তা চলে গেছে বাঁশবাড়ী হয়ে। এই রাস্তাতে যাওয়ার পথে পড়ে সাত গম্বুজ মসজিদ।

এর ছাদে রয়েছে তিনটি বড় গম্বুজ এবং চার কোণের প্রতি কোনায় একটি করে অনু গম্বুজ থাকায় একে সাত গম্বুজ মসজিদ বলা হয়। এর আয়তাকার নামাজকোঠার বাইরের দিকের পরিমাণ দৈর্ঘ্যে ১৭.৬৮ এবং প্রস্থে ৮.২৩ মিটার। এর পূর্বদিকের গায়ে ভাঁজবিশিষ্ট তিনটি খিলান এটিকে বেশ আকর্ষণীয় করে তুলেছে। পশ্চিম দেয়ালে তিনটি মিহরাব রয়েছে। দূর থেকে শুভ্র মসজিদটি অত্যন্ত সুন্দর দেখায়। মসজিদের ভিতরে ৪টি কাতারে প্রায় ৯০ জনের নামাজ পড়ার মত স্থান রয়েছে।

মসজিদের পূর্বপাশে এরই অবিচ্ছেদ্য অংশে হয়ে রয়েছে একটি সমাধি। কথিত আছে, এটি শায়েস্তা খাঁর মেয়ের সমাধি। সমাধিটি ‘বিবির মাজার’ বলেও খ্যাত। এ কবর কোঠাটি ভেতর থেকে অষ্টকোনাকৃতি এবং বাইরের দিকে চতুষ্কোনাকৃতির। বেশ কিছুদিন আগে সমাধিক্ষেত্রটি পরিত্যক্ত এবং ধ্বংসপ্রাপ্ত ছিল। বর্তমানে এটি সংস্কার করা হয়েছে। মসজিদের সামনে একটি বড় উদ্যানও রয়েছে। একসময় মসজিদের পাশ দিয়ে বয়ে যেত বুড়িগঙ্গা। মসজিদের ঘাটেই ভেড়ানো হতো লঞ্চ ও নৌকা। কিন্তু বর্তমান অবস্থায় তা কল্পনা করাও কষ্টকর। বড় দালানকোঠায় ভরে উঠেছে মসজিদের চারপাশ। প্রত্নত্ত অধিদপ্তর এর দেখাশোনার দায়িত্ত গ্রহণ করেছে।

তারা মসজিদ: পুরানো ঢাকার আরমানিটোলায় আবুল খয়রাত সড়কে অবস্থিত। সাদা মার্বেলের গম্বুজের ওপর নীলরঙা তারায় খচিত এ মসজিদ নির্মিত হয় আঠারো শতকের প্রথম দিকে। মসজিদের গায়ে এর নির্মাণ-তারিখ খোদাই করা ছিল না। জানা যায়, আঠারো শতকে ঢাকার ‘মহল্লা আলে আবু সাঈয়ীদ’-এ (পরে যার নাম আরমানিটোলা হয়) আসেন জমিদার মির্জা গোলাম পীর (মির্জা আহমদ জান)। ঢাকার ধণাঢ্য ব্যক্তি মীর আবু সাঈয়ীদের নাতি ছিলেন তিনি। মির্জা গোলাম পীর এ মসজিদ নির্মাণ করেন। ‌মির্জা সাহেবের মসজিদ হিসেবে এটি তখন বেশ পরিচিতি পায়। ১৮৬০ সালে মারা যান মির্জা গোলাম পীর। পরে, ১৯২৬ সালে, ঢাকার তৎকালীন স্থানীয় ব্যবসায়ী, আলী জান বেপারী মসজিদটির সংস্কার করেন। সে সময় জাপানের রঙিন চিনি-টিকরি পদার্থ ব্যবহৃত হয় মসজিদটির মোজাইক কারুকাজে।

মোঘল স্থাপত্য শৈলীর প্রভাব রয়েছে এ মসজিদে। ঢাকার কসাইটুলীর মসজিদেও এ ধরনের বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করা যায়। উল্লেখ্য, দিল্লি, আগ্রা ও লাহোরের সতের শতকে নির্মিত স্থাপত্যকর্মের ছাপ পড়ে মোঘল স্থাপত্য শৈলীতে।

মির্জা গোলামের সময় মসজিদটি ছিল তিন গম্বুজঅলা, দৈর্ঘ্যে ৩৩ ফুট (১০.০৬ মিটার) আর প্রস্থে ১২ ফুট (৪.০৪ মিটার)। আলী জানের সংস্কারের সময়, ১৯২৬ সালে, মসজিদের পূর্ব দিকে একটি বারান্দা বাড়ানো হয়। ১৯৮৭ সালে তিন গম্বুজ থেকে পাঁচ গম্বুজ করা হয়। পুরনো একটি মেহরাব ভেঙে দুটো গম্বুজ আর তিনটি নতুন মেহরাব বানানো হয়।

মসজিদের বতর্মান দৈর্ঘ্য ৭০ ফুট (২১.৩৪ মিটার), প্রস্থ ২৬ ফুট (৭.৯৮ মিটার)।

লালবাগ শাহী মসজিদ: ঢাকার লালবাগ কেল্লার সন্নিহিত স্থানে অবস্থিত। মসজিদটি নির্মাণ করা হয় ১৭০৩ খ্রিস্টাব্দে। তৎকালীন ঢাকার উপ-শাসক সম্রাট আওরঙ্গজেবের প্রপৌত্র ফর্‌রুখশিয়রের পৃষ্ঠপোষকতায় মসজিদটি নির্মিত হয়।

বিনত বিবির মসজিদ: বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা শহরের পুরান ঢাকা এলাকায় অবস্থিত একটি মধ্যযুগীয় মসজিদ। নারিন্দা পুলের উত্তর দিকে অবস্থিত এই মসজিদটির গায়ে উৎকীর্ণ শিলালিপি অনুসারে ৮৬১ হিজরি সালে, অর্থাৎ ১৪৫৭ খ্রিস্টাব্দে সুলতান নাসিরুদ্দিন মাহমুদ শাহের শাসনামলে মারহামাতের কন্যা মুসাম্মাত বখত বিনত বিবি এটি নির্মাণ করান।

ঢাকা শহরের নারিন্দায় অবস্থিত বিনত বিবির মসজিদ, ২০১৬ সালে

নারিন্দার যে প্রাচীন পুলের পাশে মসজিদটি অবস্থিত, তার নাম হায়াত বেপারির পুল। মসজিদটি চৌকোনা, এবং এতে একটি গম্বুজ রয়েছে। এই মসজিদটি ঢাকার সবচেয়ে পুরাতন মুসলিম স্থাপনার নিদর্শন হিসাবে অনুমিত।

করতলব খান মসজিদ: বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা শহরের পুরান ঢাকার বেগম বাজার এলাকায় অবস্থিত একটি প্রাচীন মসজিদ। এটি নওয়াব দেওয়ান মুর্শিদ কুলি খান কর্তৃক নির্মিত হয়েছিল। এটি ঢাকা শহরের আধুনিক কারাগারের পাশে অবস্থিত।

১৭০১-১৭০৪ সালের মধ্যে এই মসজিদটি নির্মাণ করেন এবং দেওয়ান মুর্শিদ কুলি খানের নামে এর নাম করণ করা হয়, তিনি কর্তালাব খান নামে পরিচিত ছিলেন। স্থানীয়রা মসজিদটিকে বেগমবাজার মসজিদ নামে চেনে।

পাঁচ গম্বুজ বিশিষ্ট এই মসজিদটি উঁচু ভিত্তির উপর নির্মাণ করা হয়।

মুসা খানের মসজিদ বা মুসা খাঁর মসজিদ: বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা শহরে অবস্থিত একটি মধ্যযুগীয় মসজিদ। এটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এর শহীদুল্লাহ হল ছাত্রাবাসের নিকটে ও কার্জন হলের পিছনে অবস্থিত। ধারণা করা হয় যে, এই মসজিদটি ঈসা খাঁর পুত্র মুসা খান নির্মাণ করেন। ঢাকা শহরে এটি প্রাক-মুঘল স্থাপত্যের একটি নিদর্শন

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হল প্রাঙ্গণে শহীদুল্লাহ হলের উত্তর-পশ্চিম কোণে মুসা খাঁর মসজিদ নির্মিত হয় আনুমানিক ১৬৭৯ সালে।

একটি উঁচু প্লাটফর্মের উপর নির্মিত মসজিদটির নিচতলায় কয়েকটি কক্ষ রয়েছে। এগুলোতে আগে মসজিদ সংশ্লিষ্টরা বাস করলেও এর সবগুলোই এখন পরিত্যক্ত। তিন গম্বুজ বিশিষ্ট মসজিদটির একটি গম্বুজে বড় ফাটল দেখা দিয়েছে। ঐ ফাটল দিয়ে গত বর্ষায় বৃষ্টির পানি মসজিদের ভিতরে পড়েছে বলে জানিয়েছেন মুসল্লিরা। মসজিদের পশ্চিম ও পূর্ব প্রাচীর প্রায় ৬ ফুট পুরু। উত্তর ও দক্ষিণ প্রাচীর ৪ ফুট পুরু। চার দেয়াল, ছাদ এবং গম্বুজ— সবকিছুতেই দীর্ঘদিন ধরে শেওলা জমে কালচে হয়ে গেছে। মসজিদের দুই মূল স্তম্ভে বড় ধরনের ভাঙন সৃষ্টি হয়েছে। ইতিহাসবিদ আহমদ হাসান দানীর ‘ঢাকা:অ্যা রেকর্ড অব ইটস চেঞ্জিং ফরচুনস’ গ্রন্থে উল্লেখিত বর্ণনামতে, মসজিদটি মুসা খাঁর নামে হলেও স্থাপত্যশৈলী অনুযায়ী এটি শায়েস্তা খাঁর আমলে বা তারপরে নির্মিত হয়েছিল।

শায়েস্তা খাঁর মসজিদ: বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা শহরের পুরান ঢাকার একটি অন্যতম প্রাচীন মসজিদ এটি। কথিত আছে, মসজিদটি শায়েস্তা খাঁ যখন প্রথম ঢাকায় সুবেদার হিসেবে এসেছিলেন তখন তৈরি করা হয়েছিল। ঢাকা শহরে শায়েস্তা খাঁর সুবেদার হিসেবে আসার পরে তিনি বিভিন্ন ইমারত নির্মাণ করেন সাথে তার নিজে থাকার জন্য মিডফোর্ড এলাকায় ইমারত ও মসজিদ নির্মাণ করেন। শায়েস্তা খাঁর মসজিদ নামের ছোট মসজিদটিও বুড়িগঙ্গার কোল ঘেঁষে মিটফোর্ড হাসপাতালের পিছনে অবস্থিত। বিংশ শতকের প্রথম দিকে মসজিদটি পুড়ে গেলে তা আবার পুনঃনির্মান করা হয়।

হাজী শাহাবাজের মাজার ও মসজিদ: বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা শহরের রমনা এলাকায় অবস্থিত একটি প্রাচীন মসজিদ। মোগল শাসনামলে শাহজাদা আযমের সময়কালে ১৬৭৯ খ্রিস্টাব্দে এটি নির্মিত হয়। মসজিদটি হাইকোর্টের পিছনে এবং তিন নেতার মাজার এর পূর্ব পার্শ্বে অবস্থিত। এর চত্ত্বরে হাজী শাহবাজের সমাধি অবস্থিত। দৈর্ঘ্যে মসজিদটি ৬৮ ফুট ও প্রস্থে ২৬ ফুট। এতে তিনটি গম্বুজ রয়েছে।

ঐতিহাসিক মুনতাসীর মামুনের মতানুসারে হাজী শাহবাজ ছিলেন একজন অভিজাত ধনী ব্যবসায়ী, যিনি কাশ্মীর হতে সুবা বাংলায় এসে টঙ্গী এলাকায় বসতি স্থাপন করেন। ১৬৭৯ সালে তিনি জীবিত থাকাকালেই এই মসজিদ ও নিজের মাজার নির্মাণ করেন। তৎকালে সুবাহদার ছিলেন শাহজাদা মুহাম্মদ আজম।

মসজিদ ভবনটির স্থাপত্যে উত্তর ভারতীয় মোগল-রীতি লক্ষ্য করা যায়।

 

প্রাচীন চুড়িহাট্টা মসজিদ বা চুড়িহাট্টা মসজিদ: বাংলাদেশের অন্যতম একটি পুরাতাত্ত্বিক নিদর্শন, যা ঢাকা মহানগরের পুরান ঢাকার উমেশ চন্দ্র দত্ত লেন ও হায়দার বকশ লেনের তেমাথায় অবস্থিত। স্থানীয়ভাবে মসজিদটি চুড়িহাট্টা শাহী মসজিদ নামে পরিচিত ছিল। মসজিদটির প্রকৃত অবস্থান ছিল চকবাজারের সামান্য পশ্চিম দিকে ২৬-২৭ শেখ হায়দার বকশ লেনে। ঐতিহাসিক তথ্যমতে, মসজিদটি ৩৭০বছর পুরনো (২০১৮ খ্রিস্টাব্দ)। তবে প্রাচীন মসজিদ স্থাপত্যটি বর্তমানে বিলুপ্ত, সে জায়গায় গড়ে তোলা হয়েছে আধুনিক স্থাপত্য।

চুড়িহাট্টা মসজিদটির দৈর্ঘ্য ৩০ ফুট এবং প্রস্থ ১৩ ফুট।মসজিদটির কোন গম্বুজ ছিল না, এবং সমতল ছাদ ছিল। এই হিসাবে মসজিদটি সাধারণ বাঙালি স্থাপত্যের খড়ের ছাদওয়ালা দো চালা ঘরের মতন ছিল। ড. দানী’র মতে, মসজিদটি আয়তাকৃতির এবং এর চার কোণে চারটা টাওয়ারসদৃশ মিনার ছিল। পূর্বদিকে ৩টি দরজাপথ রয়েছে, যার প্রতিটি দুটো পরিপূর্ণ আর্চ বা কীলকে গিয়ে খুলতো। সামনের দিকটা বিভিন্ন আয়তাকৃতি আর কার্ণিশ দ্বারা অলঙ্কৃত ছিল। সামনের দেয়াল প্যানেল দ্বারা অলঙ্কৃত ছিল। এছাড়া উত্তর ও দক্ষিণ দেয়ালে আলো-বাতাস চলাচলের সুবিধার জন্য ১টি করে দরজা ছিল। অভ্যন্তরভাগ ঢাকা ছিল সংস্পর্শী দুটো ভোল্টেড ছাদ দ্বারা, সংযোগস্থলটা আর মধ্যখানটা ছিল বাঁকানো। তবে এজাতীয় ভোল্টেড ছাদকে তিনি উত্তর ভারতীয় পিরামিডাকৃতির স্থাপত্বের সাথে তুলনা করে, বাংলাদেশের স্থানীয় স্থাপত্য থেকে পৃথক বলেছেন।

মসজিদটির একটি শিলালিপি পাওয়া যায়; শিলালিপিতে মসজিদটির নির্মাতা হিসেবে মোহাম্মদী বেগ কিংবা মোহাম্মদ বেগ নামের এক ব্যক্তির কথা বলা হয়েছে। তখন ছিল শাহ সুজার রাজত্বকাল।

বিভিন্ন ঐতিহাসিক তথ্য-উৎস থেকে জানা যায়, মসজিদটি মুঘল আমলের স্থাপত্য নিদর্শন। সুবাদার শাহ সুজার সময়ে ১৬৪৯ খ্রিস্টাব্দে মসজিদটি নির্মিত হয়। জেমস ওয়াইযের ১৮৮৪ খ্রিস্টাব্দের লেখানুযায়ী, মুঘল আমল থেকেই মুসলমান কারিগরেরা কাচের চুড়ি তৈরি করে পুরান ঢাকার চকবাজারে বেচাকেনা করতেন, তাই এই পুরো এলাকাটি স্থানীয়ভাবে “চুড়িহাট্টা” নামে পরিচিত। জানা যায়, চুড়ির এইসব কারিগরেরা নামাজ পড়ার জন্যই গড়ে তোলেন মসজিদটি। মসজিদটির নির্মাণ বিষয়ে আলাদা আলাদা বক্তব্যও পাওয়া যায়।

পুরোনো স্থাপনাটি ভেঙে দিয়ে মসজিদটির জায়গায় নির্মিত হয়েছে নতুন মসজিদ ভবন। নতুন ভবনের দোতলার মিহরাবে আদি মসজিদের ফলকটি স্থাপন করা হয়েছে। এছাড়া নিচতলার মিহরাব ও মেঝে গ্রানাইট পাথর দিয়ে ছেয়ে দেওয়া হয়েছে। এছাড়া মসজিদে একটি উঁচু মিনারের কাজ হচ্ছে।

খান মুহাম্মদ মির্ধার মসজিদ: বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা শহরের পুরান ঢাকা এলাকার আতশখানায় অবস্থিত একটি প্রাচীন মসজিদ এটি। ইহা ১৭০৬ খ্রিস্টাব্দে নায়েবে নাযিম ফররুখশিয়ারের শাসনামলে নির্মিত হয়। ইতিহাসবিদ মুনতাসীর মামুনের মতে, ঢাকার প্রধান কাজী ইবাদুল্লাহের আদেশে খান মুহাম্মদ মির্ধা এটি নির্মাণ করেন।

বর্তমানে বাংলাদেশ সরকারের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ এই মসজিদের রক্ষণাবেক্ষণ করে থাকে।

কাস্বাবটুলি জামে মসজিদ: পুরান ঢাকার কসাইটুলির পিকে ঘোষ রোডে অবস্থিত শতবর্ষী একটি মসজিদ। স্থানীয়ভাবে এটি ‘চিনির টুকরা মসজিদ’ নামে পরিচিত। মূলত, মসজিদের গায়ে চিনামাটির সাদা টুকরাগুলো দেখতে চিনির দানার মতো হওয়ায় স্থানীয় বাসিন্দারা মসজিদটিকে এই নামে ডাকেন।

মসজিদটি ১৯০৭ সালে নির্মিত হয়। আবদুল বারি নামে এক ব্যবসায়ী এটি নির্মাণ করেন। ১৯৭৯ সালে কারুকার্যে কোন পরিবর্তন না করে মসজিদ সংস্কার করা হয়। পরে মসজিদটির ধারণক্ষমতা বাড়াতে এর পূর্ব ও উত্তর দিকের সম্প্রসারণ করা হয়। মূল মসজিদটি একতলা হলেও বর্ধিত অংশটি তিনতলা। বর্তমানে এটি প্রায় পাঁচ কাঠা জায়গায় অবস্থিত।

মূল মসজিদটির ভবনে সমতল কোন ছাদ নেই। ছাদবিহীন মসজিদের প্রতিটি পিলারের মাথায় রয়েছে গম্বুজ। মূল অংশের ছাদে রয়েছে তিনটি গম্বুজ। তিনটি গম্বুজের মাঝের গম্বুজটি বড় আর দুপাশের দুটির আকার মাঝারি। এছাড়া চার কোণায় রয়েছে চারটি বুরুজ, চারটির কারুকাজ একই ধরনের। গম্বুজ ও বুরুজগুলোর মাথায় পদ্মফুলের নকশা করা তির রয়েছে। ছাদের চারদিক ঘিরে আছে অনেকগুলো টারেট। এছাড়া ছয়টি ছোট ও দুটি জোড়া পিলারের দুটি গম্বুজ রয়েছে। গম্বুজগুলোর উচ্চতা ৫-১২ ফুট।

মসজিদটির মূল বৈশিষ্ট্য হল এতে করা ‘চিনিটিকরির কারুকাজ’। মূল ভবনের ভেতরে ও বাইরের দেয়ালসহ সম্পূর্ণ জায়গায় চিনিটিকরি পদ্ধতির মোজাইক দিয়ে নকশা করা হয়েছে। চিনামাটির ভাঙা টুকরা আর রঙিন কাচ দিয়ে গোলাপ ঝাড়, আঙুরের থোকা, ফুলদানির ছবি মসজিদের দেয়ালে-খিলানে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। মসজিদের ভেতরের মিহরাব ও মিহরাবের আশপাশের নকশাগুলি হচ্ছে সবচেয়ে রঙিন ও জমকালো।

আম্বর শাহ শাহী মসজিদ: খাজা আম্বর ছিলেন শায়েস্তা খানের খাজা প্রধান। তিনি ১৬৭৯-৮০ সালে নির্মাণ করেছিলেন একটি মসজিদ। যেটি এখন কারওয়ান বাজারে ‘খাজা আম্বর শাহ জামে মসজিদ’ নামে টিকে আছে। মসজিদটি ঢাকার কাওরান বাজারে অবস্থিত।

মসজিদ ভবনটি ৩ গম্বুজ বিশিষ্ট। সুন্দর কারুকাজপূর্ণ এবং নকশা করা। মসজিদের মূল ভবনের পাশে ৫ তলা বিশিস্ট আরো একটি ভবন রয়েছে যার আয়তন ১৫০০ বর্গফুট। মসজিদের বাইরে উঠানে সাধারণ গাছ ছাড়াও বেশ কয়েকটি ফুলের গাছও রয়েছে। মসজিদের পশ্চিম পার্শ্বে একটি মাঠ রয়েছে। মসজিদের নিজস্ব লাইব্রেরী রয়েছে। এখানে হাদীস, কোরআন এবং তাফসীরসহ বিভিন্ন ইসলামী বই পুস্তকের সংগ্রহ রয়েছে। এখানে ৫০০টির বেশি বইয়ের সংগ্রহ রয়েছে।

কাকরাইল মসজিদ: বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার কাকরাইল এলাকায় রমনা পার্কের পাশে অবস্থিত একটি মসজিদ। এটি বাংলাদেশে তাবলীগ জামাতের মারকায বা প্রধান কেন্দ্র। ১৯৫২ সালে এই মসজিদটি তাবলীগ জামাতের মারকায হিসেবে নির্ধারিত হয়। মসজিদটির আদি নাম ছিল মালওয়ালি মসজিদ।

কাকরাইল মসজিদ সর্বপ্রথম কবে এবং কার দ্বারা নির্মিত হয়েছে তা নিয়ে মতভেদ আছে। কাকরাইল মসজিদের জৈষ্ঠ ব্যক্তিবর্গদের থেকে জানা যায় যে, নবাব পরিবারের যে কোন একজন সম্মানিত ব্যক্তি মসজিদটি প্রতিষ্ঠা করেন। অনেকের ধারণা ৩০০ বছর আগে এ মসজিদ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। মসজিদটি নবাবদের অন্যান্য স্থাপনার সাদৃশ্যেই নির্মিত ছিল। শুরুতে মসজিদটি স্বল্প পরিসরে ছিল। সামনে ছোট্ট একটি পুকুর ছিল। আবার কেউ কেউ বলেন, চল্লিশের দশকে রমনা পার্কের মালিগণ টিন দিয়ে ছোট একটি মসজিদ নির্মাণ করেছিলেন। পরবর্তীতে ১৯৬০এর দশকে তাবলীগ জামাতের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ ইঞ্জিনিয়ার মরহুম হাজী আব্দুল মুকিতের তত্ত্বাবধানে তিন তলা মসজিদটি পুনঃনির্মাণ করেন।

বর্তমান মসজিদের জায়গায় পূর্বে নবাব পরিবারের নির্মিত একটি মসজিদ ছিল। যার অস্তিত্ব এখন আর নেই। বর্তমানের মসজিদটি ইঞ্জিনিয়ার মরহুম হাজী আব্দুল মুকিতের নকশায় নির্মিত। মসজিদের ছাদ সংলগ্ন ত্রি-ভুজ আকৃতির কারুকাজ রয়েছে। মসজিদটির স্তম্ভগুলো চৌকোণা আকৃতির। মসজিদের পশ্চিম দিকের দেয়ালটি ঢেউ খেলানো। এছাড়াও মসজিদটির তিন দিকে প্রশস্ত বারান্দা রয়েছে। দক্ষিণ ও উত্তর পাশে মুসল্লিদের অজু করার জন্য দুটি পুকুরসাদৃশ্য হাউজ রয়েছে। এ পুকুরের চতুষ্পার্শে শতাধিক লোক একত্রে ওজু করতে পারেন। এছাড়া মসজিদের বাইরেও অজু করার আধুনিক ব্যবস্থা আছে। মসজিদ থেকে একটু দূরে উত্তর দিকে টয়লেট এবং বাথরুমের জন্য রয়েছে দোতলা একটি ভবন।

বায়তুল মোকাররম ( بيت المكرّم‎‎): বাংলাদেশের জাতীয় মসজিদ। মসজিদটি ঢাকায় অবস্থিত। এর স্থাপত্যশৈলী অত্যন্ত দৃষ্টিনন্দন। পাকিস্তানের বিশিষ্ট শিল্পপতি লতিফ বাওয়ানি ও তার ভাতিজা ইয়াহিয়া বাওয়ানির উদ্যোগে এই মসজিদ নির্মাণের পদক্ষেপ গৃহীত হয়। বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদ এর অবকাঠামো মক্কা শরীফের ‘কাবা’ এর মত।

এই মসজিদটিতে মুগল স্থাপত্যশৈলীর ঐতিহ্যগত বৈশিষ্ট্যের পাশাপাশি বেশ কিছু আধুনিক স্থাপত্যশৈলীর নিদর্শনও রয়েছে। মক্কাতে অবস্থিত কাবার অনুরূপে তৈরিকৃত বায়তুল মোকাররমের বৃহৎ ঘনক্ষেত্রটি একে বিশেষ বৈশিষ্ঠ্যমন্ডিত করেছে। যা এই মসজিদটিকে বাংলাদেশের অন্য যেকোন মসজিদ থেকে আলদা করেছে।

আব্দুল লতিফ ইব্রাহিম বাওয়ানি প্রথম ঢাকাতে বিপুল ধারণক্ষমতাসহ একটি গ্র্যান্ড মসজিদ নির্মাণের পরিকল্পনার কথা প্রকাশ করেন। ১৯৫৯ সালে ‘বায়তুল মুকাররম মসজিদ সোসাইটি’ গঠনের মাধ্যমে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া হয়। পুরান ঢাকা ও নতুন ঢাকার মিলনস্থলে মসজিদটির জন্য জায়গা অধিগ্রহণ করা হয়। স্থানটি নগরীর প্রধান বাণিজ্যকেন্দ্র থেকেও ছিল নিকটবর্তী। বিশিষ্ট স্থপতি টি. আব্দুল হুসেন থারিয়ানিকে মসজিদ কমপ্লেক্সটির নকশার জন্য নিযুক্ত করা হয়। পুরো কমপ্লেক্স নকশার মধ্যে দোকান, অফিস, লাইব্রেরি ও গাড়ি পার্কিংয়ের ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত হয়। পরবর্তীতে ১৯৬০ সালের ২৭ জানুয়ারি এই মসজিদের নির্মাণ কাজ শুরু হয়। এই মসজিদে একসঙ্গে ৪০ হাজার মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারেন। মসজিদের প্রধান কক্ষটি তিন দিকে বারান্দা দিয়ে ঘেরা। মিহরাবটি অর্ধ-বৃত্তাকারের পরিবর্তে আয়তাকার। আধুনিক স্থাপত্যে কম অলংকরণই একটি বৈশিষ্ট্য-যা এই মসজিদে লক্ষনীয়। এর অবয়ব অনেকটা পবিত্র কাবা শরিফের মতো হওয়ায় মুসলমানদের হৃদয়ে এই মসজিদটি আলাদা জায়গা করে নিয়েছে।

বর্তমানে এগুলো ছাড়াও রাজধানী ঢাকায় আরো অসংখ্য আধুনিক ও দৃষ্টিনন্দন মসজিদ রয়েছে। আর মসজিদের আধিক্যতার কারনেই তো ঢাকাকে ‘মসজিদের শহর’ বলা হয়। ঢাকার অলিতে গলিতে বহু মসজিদ রয়েছে। ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশের একটি তথ্যমতে, ‘মসজিদের শহর’ ঢাকায় ১০ হাজার মসজিদ রয়েছে। (ই.ফা.বা. : দৈনিক ইত্তেফাক, ০৭.১২.১৪)

 

 

লেখক:  আব্দুল আজিজ ইবনে শফিকঅনার্স (অধ্যয়নরত)ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগঢাকা কলেজঢাকা।

 

মতামত দিন