ঢাকা মিরপুরের রূপনগর আবাসিক এলাকায় গত ১৪ জানুয়ারী–২০১৮ উলামায়ে কিরামের বিশেষ জোড়ে তাবলীগ জামাআত, বিশ্ব ইজতেমা ও মাওলানা সাদ সাহেবকে নিয়ে চলমান সংকটের উপর ঢাকা মোহম্মদপুর জামি‘আতুল আবরার এবং আলী এণ্ড নূর রিয়েল এস্টেট জামি‘আ রাহমানিয়া আরাবিয়া’র শাইখুল হাদীস ও প্রধান মুফতী হযরতওয়ালা মুফতী মনসূরুল হক (দা.বা.) এক গুরুত্বপূর্ণ বয়ান পেশ করেন।

বয়ানটি নিম্নে প্রদান করা হলো–

 

নাহমাদুহু ওয়ানুসাল্লী ‘আলা রাসূলিহিল কারীম। আম্মা বা‘দ–

কুরআন শরীফের চার জায়গায় এসেছে–আম্বিয়ায়ে কিরাম চারটি কাজের দ্বারা দ্বীন কায়েম করেছেন। তা রয়েছে ১ম পারার ১৯ নং পৃষ্ঠায়, ২য় পারার ২নং পৃষ্ঠায়, ৪র্থ পারার ১০ম পৃষ্ঠায় ও ২৮ পারায় সুরা জুমু‘আয়।

এভাবে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা‘আলা জানিয়ে দিয়েছেন, রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর দ্বীনের কাজ করার পদ্ধতি কী ছিল? সেই আলোকে আমাদের দ্বীনের কাজ করতে হবে। এ সম্পর্কে আল্লাহ তা‘আলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেন–

لَقَدْ مَنَّ اللَّهُ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ إِذْ بَعَثَ فِيهِمْ رَسُولًا مِّنْ أَنفُسِهِمْ يَتْلُو عَلَيْهِمْ آيَاتِهِ وَيُزَكِّيهِمْ وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ

“আল্লাহ ঈমানদারদের উপর অনুগ্রহ করেছেন যে, তাদের মাঝে তাদের নিজেদের মধ্য থেকে নবী পাঠিয়েছেন। তিনি তাদের জন্য তাঁর আয়াতসমূহ পাঠ করেন, তাদেরকে পরিশোধন করেন এবং তাদেরকে কিতাব ও হিকমাহ শিক্ষা দেন।”

(সূরাহ আলে ইমরান, আয়াত নং ১৬৪)

এ আয়াতে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর দ্বীনের কাজকে চারভাগে ভাগ করা হয়েছে। তাই সেই ভিত্তিতে আমাদেরকে নিম্নোক্ত চারটি কাজ করতে হবে–

(১) উম্মতের কাছে আয়াত পৌঁছে দিতে হবে। এর দ্বারা তামাম মুফাসসিরে কিরাম দাওয়াত ও তাবলীগ সাব্যস্ত করেছেন। এখানে আয়াত পৌঁছে দেয়া হলো তাবলীগ।

(২) আত্মশুদ্ধির মেহনত করতে হবে। অন্তরের দশটি রোগ থেকে মুক্তি লাভ ও দশটি গুণ অর্জন। একে বলে আত্মশুদ্ধি বা তাযকিয়ায়ে বাতেন। এভাবে ইসলাহের জন্য মেহনত করতে হবে।

(৩) কুরআনের তা‘লীম দিতে হবে। এ পর্যায়ে কুরআনের তিলাওয়াত শিক্ষা দিতে হবে এবং কুরআনে যে হুকুম-আহকাম আছে অর্থাৎ আদেশ-নিষেধ সেগুলোও শিখাতে হবে।

(৪) হিকমাহ অর্থাৎ নবীজির সুন্নাত হাতে-কলমে শিখাবে। কারণ, নামাজ ফরজ হওয়ার পর আল্লাহর পক্ষ থেকে মানুষের সুরতে জিবরাঈল আ. কে পাঠানো হয়েছে হাতে-কলমে উজু-নামাজ  ইত্যাদি আমল দেখানোর জন্য।

নবীজিকে ﷺ জিবরাঈল আ. হাতে কলমে উযু শিখিয়েছেন। এমনকি উযু করার পর লজ্জাস্থান বরাবর কাপড়ের উপরে কিছু পানি ছিটিয়ে দিতে বলেছেন যাতে ইবলিস ওয়াসওয়াসা না দিতে পারে যে, পেশাবের ফোঁটা মনে হয় লেগে আছে।

মি’রাজের পরে যুহরের পর থেকে দুই দিনে নবীজিকে ﷺ জিবরাঈল আ. দশ ওয়াক্ত নামাজের প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। নবীজি ﷺ বাকি যিন্দেগি সাহাবায়ে কেরামকে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন।

আমাদের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে কাজ রেখে গেছেন, তার সবটারই ওয়ারিশ আমরা। তাবলীগেরও ওয়ারিশ, তাসাউফেরও ওয়ারিশ, তা‘লীমে কুরআনেরও ওয়ারিশ, তা‘লিমুস সুন্নাহরও ওয়ারিশ। চারটি কাজেরই আমরা ওয়ারিশ।

মাওলানা ইলিয়াস রহ. কোত্থেকে সৃষ্টি হয়েছেন? দেওবন্দ থেকে। দাওয়াত ও তবলীগ এটা দেওবন্দের অবদান। মাওলানা ইলিয়াস রহ.কে মেওয়াতে কে পাঠিয়েছেন? মাওলানা আশরাফ আলী থানবী (রহ.) পাঠিয়েছেন। তাই তাবলীগের মুরুব্বী থানবী (রহ.) এবং দাওয়াতুল হকেরও মুরুব্বী থানবী (রহ.)।

একবার কিছু লোক চেয়েছিল–তাবলীগে নাহি আনিল মুনকার যোগ করার জন্য। এতে দলটি দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে গিয়েছিল। তখন তারা থানবী রহ.-এর কাছে এলে তিনি বললেন, এটা যোগ করা যাবে না। কারণ, তাবলীগের কাজ হচ্ছে সারা দুনিয়ায় দাওয়াত পৌঁছে দেয়া যে, ইসলাম একমাত্র মুক্তির ধর্ম। পুরো দ্বীন পৌঁছানো দরকার নেই। অন্যথায় তোমরা পুরো দুনিয়াতে যেতে পারবে না। বাধাগ্রস্থ হবে। ঢুকতে দেবে না।

তখন থানবী রহ. নাহি আনিল মুনকারের কাজটি বিশেষভাবে দিয়েছিলেন মজলিসে দাওয়াতুল হককে। তাই দাওয়াতুল হকে শুধু সুন্নাতের মশক করানো হয় না, বরং সেই সাথে এখানে গুনাহে কবীরা কী এবং তাত্থেকে বাঁচার পথ কী–তার তালীমও করা হয়। শিখানো হয় যে, এগুলো গুনাহে কবীরা, এগুলো তোমরা করবে না।

যেমন– সুলাইমান আ. -এর জামানায় যাদুর তা‘লীম করা হত। কেন? দেখানো হতো, এগুলো কুফরী কথা, এগুলো করবে না। এ তা‘লীম যাদু করার জন্য নয়, যাদু বর্জন করার জন্য। তেমনি দাওয়াতুল হক গুনাহে কবীরা কী তা তা‘লীম করে গুনাহে কবীরা করার জন্য নয়, গুনাহে কবীরা থেকে বাঁচার জন্য।

তাই আমাদের দাওয়াতে তাবলীগও আনজাম দিতে হবে, খানকাও আনজাম দিতে হবে। তা‘লীমে কিতাব তো মাদরাসায় হচ্ছে, আর দাওয়াতুল হকের দ্বারা আমলী মশকের মাধ্যমে তা‘লীমে সুন্নাহও করতে হচ্ছে। এই সবগুলো কাজ আনজাম দিতে হবে একই সঙ্গে।

আলহামদুলিল্লাহ, এখন আলেমগণ তাবলীগের ব্যাপারে যেভাবে সতর্ক হয়েছেন, এটা ধরে রাখতে হবে। এটা যদি আমরা আগের থেকে ধরতাম, তাহলে হয়তো ইত্তেহাদুল জুহালা কায়েম হতো না। আমাদের এই ভাবনা ঠিক না যে, একভাবে চলছে চলুক, ওরা  ঐদিক সামলাচ্ছে, আমরা এই দিক সামলাই। আমরা একদিকে খেয়াল একটু কমিয়ে দিয়েছি। তাই অনেক বড় জাহেল কিয়াদত হয়ে গেছে এবং তারা আর আলেমদের মানছেই না। এ জন্য আল্লাহ তা‘আলা আমাদেরকে যে সহীহ বুঝ দিয়েছেন, এর উপর বাকি যিন্দেগী কায়েম থাকতে হবে এবং ছাত্র-শিক্ষক নিয়ে এ কাজকে সহীহভাবে ধরে রাখার জন্য যা কিছুর দরকার তা করতে হবে। এ কাজ থেকে সরে থাকা যাবে না। কোনো ব্যক্তির জন্য আমরা তাবলীগ করিনি আর ব্যক্তির জন্য ছাড়বোও না।

মাওলানা সা‘দ সাহেব সম্পর্কে কথা হলো, তার সাথে আমাদের ব্যক্তিগত কোনো আক্রোশ নেই। সমস্যা হচ্ছে, তিনি কিছু বক্তব্য দিয়েছেন–যা সরাসরি কুরআন-সুন্নাহ বিরোধী। কোনো অবস্থাতে কুরআন-সুন্নাহ তা সাপোর্ট করে না।

কুরআন না বুঝে পড়া যাবে না এটা উনি বলেছেন। যেটা আগে মওদূদী বলেছেন। অথচ আলিফ-লাম-মীম এর কোনো অর্থ মানুষ বলতে পারবে না। অথচএখানে তিনটি হরফ পড়লে ৩০ নেকি পাওয়া যাবে।

আল্লাহ তা‘আলা জানেন, কিয়ামতের আগে কিছু বাতিল ফিরকার লোক আসবে–যারা বলবে, তোতার মত কুরআন পড়লে সওয়াব হবে না। তাই আগেই তার দাঁতভাঙ্গা জবাব হাদীসে দেয়া হয়েছে।

কত বড় মারাত্মক ভুল এটা যে, বলেছেন– কুরআন না বুঝে পড়লে সওয়াব হবে না। এরপর উনি বলেছেন, মূসা আ. মারকাজ ছেড়ে চলে গিয়েছেন, এজন্য উম্মত গোমরাহ হয়ে গেছে। কাজেই মারকাজ ছেড়ে যাওয়াটা ঠিক নয়। কত বড় জাহেল মতবাদ সৃষ্টি করা হয়েছে। নাউযুবিল্লাহ।

এটা জাহেল মতবাদ হওয়ার কারণ হলো– একতো নবী সম্পর্কে, দ্বিতীয়তঃ তাকে স্বয়ং রাব্বুল আ‘লামীন আদেশ করেছেন সেখানে যেতে। বলেছেন, মূসা! তুমি তূর পাহাড়ে এসো, ই‘তিকাফ কর, তোমাকে কিতাব দেওয়া হবে। উনি আল্লাহর আদেশে কিতাব আনতে গিয়েছেন। উনি কোথায় মারকাজ ছাড়লেন?, উনি কি নিজের পক্ষ থেকে গেছেন? আল্লাহ আদেশ করেছেন বলেই গেছেন।

তারপর সাদ সাহেব বলেছেন, হেদায়াত যদি আল্লাহ তা‘আলার কাছে হতো, তাহলে আর নবী পাঠানোর কী দরকার ছিল। এগুলোর ব্যাখ্যা করব না। এটাও তার মারাত্মক ভুল।

এভাবে তিনি বলেছেন, একমাত্র মসজিদভিত্তিক দাওয়াতের কাজ হলো দ্বীনী কাজ। এর বাইরে যা হচ্ছে এগুলো একটাও দ্বীনী কাজ না। মাদরাসার কোনো পাত্তাই নেই।

তার আরেক বিতর্কিত বক্তব্য হলো– যারা ক্যামেরাওয়ালা মোবাইল রাখে, তারা সব উলামায়ে সূ। অথচ উনার সাথে যে লোক আছেন, তিনি কিন্তু সর্বক্ষণ ক্যামেরাওয়ালা মোবাইল ব্যবহার করছেন। তিনি প্রতিনিয়ত উনার বক্তব্য সারা বাংলাদেশে পাঠাচ্ছেন। তাহলে উনার লোকই তো উনার ফাতাওয়া মানছেন না।

এরকম কিছু কথা উনার থেকে প্রকাশ পেয়েছে। যেটা সাহারানপুর মাদরাসার উলামায়ে কেরাম, দারুল উলুম দেওবন্দের উলামায়ে কেরাম ও আমার শায়খের যিনি জানেশীন হাকীম হযরত কালীমুল্লাহ সাহেব দা.বা. উনারা ভুলগুলো ধরিয়ে দিয়েছেন।

এরকম ভারতের অনেক বড় বড় ব্যক্তিত্ব মাওলানা আরশাদ মাদানী দা.বা.ও উনার ভুল ধরিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু তিনি কারো কথায় কর্ণপাত করেননি।

তাকে বলা হয়েছে– আপনি মানুষকে বলুন, আমার থেকে এই এই কথাগুলো ভুল হয়েছে, আর এটা এটা সহীহ কথা। দেওবন্দ আর সাহারানপুর তো শুধু এটাই চেয়েছে। আর তো কিছু চায়নি। তারা বলেননি– আপনি কাজ বন্ধ করুন, আপনি অনুপযুক্ত। এসব কিছু তো বলেননি। তারা যা বলেছেন, এটা তওবার নিয়ম।

এই ভুলের কারণে অনেক মানুষ গোমরাহ হয়েছে। তাই উনাকে একটা একটা করে ভুল বলতে হবে এবং সেটার শুদ্ধ কী তা বলতে হবে। শুধু এ কথা বললে হবে না যে, আমি রুজু করলাম! শুধু “আমি রুজু করলাম” বললে তাওবা পূর্ণ হবে না।

আর তিনি কাকরাইল মারকাজে যেটা বলেছেন, তা তো আরো বেহুদা কথা। বলেছেন, কেউ যদি কোনো ভুল করে বা আমার যদি কোনো ভুল হয়ে থাকে, তাহলে স্বীকার করা উচিত। “যদি” বলার দ্বারা উদ্দেশ্য– ভুল হয়েছে কিনা সন্দেহ আছে। উনার সাথে যে বাংলাদেশের পাঁচজন আলেম ও শূরার সদস্য ছিলেন, তখন যদি তিনি বলতেন, এখন থেকে আমি যে মজলিসে যাব যে ভুলগুলো হয়েছে তার তালিকা বানিয়ে সেগুলোর সঠিক ব্যাখ্যা দিব, তাহলে আর কারো বিমানবন্দরে যাওয়া লাগতো না, আর উনারও কাকরাইলেও যেতে হতো না, উনি টঙ্গীর ময়দানে বয়ান করতে পারতেন।

এখনও যদি উনি ভুলগুলো লিস্ট করে দেওবন্দ যেভাবে বলেছে সেভাবে প্রত্যেকটি ভুল উল্লেখ করে এর সঠিক ব্যাখ্যা বিভিন্ন মজলিসে দেন, তাহলে আমরা আবারও তাকে সসম্মানে বাংলাদেশে নিয়ে আসব।

উনি বলেছেন, ভবিষ্যতে আমি এ ভুলগুলো থেকে তওবা করব। কিয়ামতের আগের দিন তিনি এই ভুলগুলো স্বীকার করবেন! তাহলে আমরাও উনাকে ভবিষ্যতে আনব।

বাচ্চার গায়ে যদি কোনো নাপাক লেগে যায়, এই অবস্থায় তাকে কেউ কোলে নেবে? আগে সাফ করে তারপর কোলে নেবে। আপনাকে আমরা কোলে নেব। আপনার সাথে আমাদের ব্যক্তিগত কোনো আক্রোশ নেই। আল্লাহর কসম! আল্লাহর কসম! আল্লাহর কসম! কোনো ব্যক্তিগত আক্রোশ নেই।

আপনার খান্দানের অনেক কুরবানী আছে। আপনি কুরআন-সুন্নাহ বিরোধী কথা বলবেন আর ভুলগুলো থেকে তওবা করতে বললে “কারলেঙ্গে” (অর্থাৎ করে নিবো ভবিষ্যতে) বলবেন, তা হবে না। আগে ভুলগুলো স্বীকার করে সঠিক ব্যাখ্যা দিন। তাহলে কালকে আপনাকে বুকে মিলিয়ে নিব।

আপনার ব্যক্তির সাথে আমাদের কোনো বিরোধ নেই। এই কাজটা করে যদি আপনি আসতেন, তাহলে কোনো বিরোধ হতো না। আপনি চিঠিতে বলেন, আমি রুজু করছি। এই কথা বললে কি হয়ে গেল? দেওবন্দ তো এই কথাই বলে যে, উনি চিঠিতে বলেন– আমি রুজু করছি আবার পর দিন মিম্বারে ওই কথাই বলেন। তাহলে রুজু হলো কিভাবে?

উনি ভুলগুলো স্বীকার করে এর সঠিক ব্যাখ্যা বলে দিন। তাহলে উনাকে উলামায়ে কেরাম খোশ আমদেদ বলে নিয়ে আসবেন। যতদিন করবেন না, ততদিন উনি বাংলাদেশে আসতে পারবেন না। কোনো জোরজবরদস্তি চলবে না। এটা দ্বীনের ব্যাপার, হকের ব্যাপার।। হকের সাথে জোর খাটিয়ে মোকাবেলা চলে না। হকের সাথে আল্লাহ আছেন।

কেউ বাতিল পক্ষ নিবেন আর আপনি তাকে মেনে চলবেন বা তার পূজা করবেন–এটা জায়িয হবে না। ইসলামে কোনো ব্যক্তি পূজা নেই এবং স্থান পূজাও নেই। কুরআন-হাদীসের কোথাও এ কথা নেই, মক্কা-মদীনায় যা দেখবে তা আমল করবে। থানবী রহ. চলে গেছেন তো তাঁর থানাভবনে এখন আর কে যায়? অথচ তাকে একসময় আল্লাহওয়ালাদের জায়গা বলা হত।

কাজেই নিজামুদ্দিন দিল্লির একটি মসজিদ মাত্র। সেটা শরী‘আতের কিছু নয়। এটা শরী‘আতের কোনো দলিল নয়। আর তাকে শরী‘আতের কোনো বরকতময় স্থান হিসেবে ঘোষণাও করা হয়নি।

আমরা দিল্লির পূজা করি না। তাই সাদ সাহেব যতক্ষণ তওবা না করবেন, আমরা উনাকে অনুসরণ করব না। দিল্লিকেও পূজা করা যাবে না, ব্যক্তিকেও পূজা করা যাবে না। স্থান কখনও মাননীয় হতে পারে না। ব্যক্তি মাননীয় হতে পারে, তবে ভুলগুলো শুধরে নিয়ে আগে তওবা করতে হবে। যদি কেউ শতভাগ হকের উপর থাকে, তাকে আমরা অনুসরণ করব। হক থেকে সরে গেলে তাকে আর মানব না।

হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. যাকে চতুর্থ খলিফার পর পঞ্চম খলিফা হিসেবে গণ্য করা হয়, তাকে একবার তার শাগরেদগণ বললেন, আল্লাহর প্রিয় হাবিবের সাহাবী! আপনি হাদীস বলেন, আমরা তা শুনি এবং তা আমল করি। কিন্তু সব কথা তো শুনে শেষ করা যায় না। সুতরাং আমরা চাচ্ছি, আপনার কাজ-কর্ম ও চলাফেরা দেখে দেখে তার অনুসরণ করে তার উপর আমল করতে। কিন্তু তিনি তার শাগরেদগণকে এ বিষয়ের অনুমতি দেননি। বরং তিনি বলেন, আমি এখনও জীবিত। আর জীবিত মানুষ ফেতনা থেকে নিরাপদ নয়। জীবিত মানুষ মৃত্যুর আগ পর্যন্ত যে কোনো সময়ে যে কোনো ফেতনায় জড়িয়ে যেতে পারে। তাই তোমরা ওই ব্যক্তির কাজ-কর্মকে অনুসরণ করতে পারো যিনি ঈমান নিয়ে চলে গেছেন।

তাঁর সেই বক্তব্যের আরবী ইবারত হলো, فَانَّ الْحَيَّ لَا تُاْمَنُ عَلَيْهِ الْفِبْنَةُ‘ (ফা ইন্নাল হাইয়া লা তু’মানু আলাইহিল ফিতনাহ)। এটা দ্বারা তিনি কী বুঝালেন? বুঝালেন, ইসলামে কোনো ব্যক্তি পূজা নেই

বাল‘আম বাউর কত বড় বুযুর্গ ছিল, কিন্তু একসময় বেঈমান হয়ে গেছে। বনী ইসরাঈলের জারসিস কত বড় বুযুর্গ ছিল, নবীর সুহবতে ছিল কত লোক, যাকাত না দেয়ার ফলে ঈমানহারা হয়ে গেছে।

সুতরাং বুঝা গেল, জীবিত মানুষের উপরে যে কোন ফিতনা আসতে পারে। তাই মাওলানা সা’দ-এর ব্যাপারে আমরা এ কথাই বলি, তার প্রতি আমাদের ব্যক্তিগত কোনো আক্রোশ নেই। তিনি কাকরাইলে সেই জুমু‘আর দিনের বয়ানেও সাহাবীদের নিয়ে একটি ভুল বয়ান করেছিলেন। যা ঠিক নয়। এটা বুঝের ভুল। সাহাবীদের ইজ্জত ঠিক রেখে কথা বলতে হবে।

সাহাবীগণ সত্যের মাপকাঠি। সাহাবীবিদ্বেষী যারা তারা নবীবিদ্বেষী। যত বাতিল দল আছে তারা সাহাবীবিদ্বেষী। কারণ, এই সাহাবীদের বাদ দিয়ে দিলে ইসলাম এমনিই ধ্বংস হয়ে যাবে। আমরা তো নবীজির কথা সরাসরি শুনি নি, সাহাবীগণের ভায়া হয়ে শুনেছি। তাই সাহাবীগণকে রুখতে পারলে ইসলামকে রুখা সহজ হবে। এ জন্য শিয়া, রাফেজী, মওদূদী এরা সবাই সাহাবীবিদ্বেষী।

তাবলীগের কিছু কিছু ব্যক্তি এখন উল্টো পথে যাচ্ছে। তারা উল্টো পথে যে যাচ্ছে, এটাও মাওলানা ইলিয়াস রহ.-এর মালফূযাত-এর মধ্যে আছে। তিনি বলেছেন, আমার এই চলতি ফিরতি জামা‘আতের সাথে যদি উলামায়ে কেরাম না থাকেন, তাহলে এটা ভবঘুরে ফিতনার জামা‘আত হবে।

এখন এটা ভবঘুরে ফিতনার জামা‘আত হয়ে যাচ্ছিল, কিন্তু আল্লাহ ব্রেক করে দিয়েছেন। উলামায়ে কিরামকে জাগিয়ে দিয়েছেন।

তাই উলামায়ে কিরামের এখন আগের মতো কম খেয়াল দিলে চলবে না। খেয়াল কিভাবে বেশি দিবেন, তার পন্থা হলো, সমস্ত মাদরাসাওয়ালাগণ পরীক্ষা হয় আগে নিন অথবা পরে নিন, ইজতেমায় যেতে হবে এটা বাধ্যতামূলক এবং যারা বড় ছাত্র আছে তাদেরকে ইজতেমায় নিতে হবে।

আর ইজতেমার ছুটিকে আলাদা দিবেন। এটা পরীক্ষার ছুটি থেকে দিবেন না। এটা আমার আবেদন।

এখন ইখতেলাফ করার সময় নয়। এখন বেশি বেশি খুরুজ করার সময়। তাই এখন আপনাদের সামনে তিনটি বিষয় খুবই গুরুত্বপূর্ণ–

১. ইজতেমায় আপনাদের যেতে হবে।

২. বড় ছাত্রদের ইজতেমায় যাওয়ার ব্যব্স্থা করতে হবে।

৩. যারা তাবলীগের সাথী, তবে আলেম না, তাদেরকে বুঝিয়ে ইজতেমায় যাওয়ার জন্য তৈরী করতে হবে।

এ তিনটি বিষয় আলেমগণের অবশ্যই পালন করত হবে। আর সাধারণ জনসাধারণের এ বিষয়সমূহের উপরই ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। এভাবে তাবলীগের কাজে আলেমগণের নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এটাই এখন সময়ের চাহিদা।

পরে কিভাবে সা’দ সাহেবকে আনা যায় তার ব্যবস্থা নেয়া হবে ইনশাআল্লাহ। তখন তাকে সাথে নিয়েই আমরা ইজতেমায় যাবো। তবে সেই ব্যবস্থা না হওয়া পর্যন্ত যেভাবেই হোক আমাদেরকে সার্বিক ব্যবস্থা গ্রহণ করে ইজতেমাকে কামিয়াব করতে হবে এবং ঐক্যবদ্ধভাবে দ্বীনের দাওয়াতের এ মহান কাজকে আনজাম দিতে হবে।

আল্লাহ আমাদের সবাইকে কবুল করুন। আমীন।

———————————

হযরত মুফতী মনসূরুল হক (দা. বা.)-এর এ বয়ানটির অডিও কপি নিম্নোক্ত লিঙ্কে পাবেন–

http://www.darsemansoor.com/audio/%e0%a6%ac%e0%a6%bf%e0%a6%b6%e0%a7%8d%e0%a6%ac-%e0%a6%87%e0%a6%9c%e0%a6%a4%e0%a7%87%e0%a6%ae%e0%a6%be%e0%a7%9f-%e0%a6%85%e0%a6%82%e0%a6%b6%e0%a6%97%e0%a7%8d%e0%a6%b0%e0%a6%b9%e0%a6%a3-%e0%a6%95/

মতামত দিন